রবিবার, ১ এপ্রিল, ২০১২

ছালাত শেষে দো‘আ পাঠ করে স্বীয় হাতের আঙ্গুল দ্বারা তিনবার চোখ মাসাহ

প্রশ্ন : অনেক মুছল্লী ছালাত শেষে দোআ পাঠ করে স্বীয় হাতের আঙ্গুল দ্বারা তিনবার চোখ মাসাহ করেন। এরূপ করার কোন দলীল আছে কি?
 
উত্তর : উক্ত আমলের প্রমাণে কোন দলীল পাওয়া যায় না। অনেক সূরা ক্বাফ-এর ২২নং আয়াত
লাক্বাদ কুনতা... পাঠ করে স্বীয় চোখ মাসাহ করেন। উক্ত মর্মেও কোন হাদীছ পাওয়া যায় না।

জান্নাত পাওয়ার আশায় চাকুরী ছেড়ে দেব, না পেটের দায়ে জান্নাত হারাব?


প্রশ্ন  : আমি বাসের হেলপার। ছালাত আদায় করার সুযোগ পাই না। আমার করণীয় কি? জান্নাত পাওয়ার আশায় চাকুরী ছেড়ে দেব, না পেটের দায়ে জান্নাত হারাব?

উত্তর : বাসের হেলপার হলেও ছালাত ত্যাগ করা যাবে না। ছালাত আদায়ের সময় বের করে নিতে হবে। উক্ত অবস্থায় যোহর ও আছর একত্রে দুই দুই রাক
আত করে পৃথক এক্বামতে জমা ও ক্বছর করবেন। অনুরূপভাবে মাগরিব তিন রাকআত ও এশা দুই রাকআত পৃথক এক্বামতে জমা ও ক্বছর করবেন। এটি দুই নিয়মে পড়া যায়। শেষের ওয়াক্তের ছালাত আগের ওয়াক্তের সাথে এগিয়ে অথবা আগের ওয়াক্তের ছালাত শেষের ওয়াক্তের সাথে পিছিয়ে একত্রে পড়বেন (বুখারী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৩৩৯, ৪৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৫)

বিশেষ কারণে বাড়ীতে থাকা অবস্থায়ও যোহর-আছর চার-চার অথবা মাগরিব-এশা তিন-চার রাকআত একত্রে জমা করে ছালাত আদায় করতে পারেন এবং তারপর সফরে বের হতে পারেন (বুখারী হা/১১৭৪)। এই সময় বা সফরকালে কেবল বিতর ও ফজরের সুন্নাত ব্যতীত আর কোন সুন্নাত পড়ার প্রয়োজন নেই (দ্রঃ ছালাতুর রাসূল পৃঃ ১৮৮-৮৯)। অনেক সময় ক্বিবলা বুঝা যায় না। তখন যেকোন দিকে মুখ করে ছালাত আদায় করা যাবে (বাক্বারাহ ১১৫; তিরমিযী হা/৩৪৫)। এছাড়াও অনেক সময় পানি ও মাটি কিছুই পাওয়া যায় না, তখন বিনা ওযূ ও তায়াম্মুমেই ছালাত আদায় করা যাবে (বুখারী হা/৩৩৬)

অতএব ছালাতের বিকল্প নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, মুমিন ও কাফির-মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল ছালাত (মুসলিম হা/১৩৪)। যে ব্যক্তি ছালাত পরিত্যাগ করল সে কুফরী করল (আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৫৭৪ ছালাত অধ্যায়)

পরিশেষে বলব, যদি ছালাত আদায়ের কোনরূপ সুযোগ না থাকে, তাহলে উক্ত চাকরী ছাড়তে হবে।

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

তিন রাক‘আত বিতর মাগরিবের ছালাতের ন্যায় পড়া

প্রশ্ন  : দিগন্ত টেলিভিশনে কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেছেন, তিন রাকআত বিতর মাগরিবের ছালাতের ন্যায় পড়ারও ছহীহ হাদীছ আছে। সুতরাং এ নিয়ে ফেৎনা করা সমীচীন নয়। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক?

উত্তর : উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
তোমরা মাগরিবের ছালাতের ন্যায় (মাঝখানে বৈঠক করে) বিতর আদায় করো না (দারাকুৎনী হা/১৬৩৪-৩৫; ছহীহ ইবনে হিববান হা/২৪২০; তুহফাতুল আহওয়াযী ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৫৩)। পক্ষান্তরে মাগরিবের ছালাতের ন্যায় বিতর পড়ার পক্ষে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (يَحْيَى بْنُ زَكَرِيَّا هَذَا يُقَالُ لَهُ ابْنُ أَبِى الْحَوَاجِبِ ضَعِيفٌ. وَلَمْ يَرْوِهِ عَنِ الأَعْمَشِ مَرْفُوعًا غَيْرُهُ). (দারাকুৎনী হা/১৬৩৭)

‘ডেসটিনি ২০০০ প্রাইভেট লিমিটেড’ যে কার্যক্রম চালাচ্ছে

প্রশ্ন : ডেসটিনি ২০০০ প্রাইভেট লিমিটেড যে কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং Multi Level Marketingপদ্ধতিতে যে লভ্যাংশ মানুষকে দিচ্ছে তা কি শরীআত সম্মত?

উত্তরঃ মৌলিকভাবে দু
টি পদ্ধতিতে যৌথ ব্যবসা করা শরীআত সম্মত। একটির নাম মুশারাকাহ (مشاركة) অর্থাৎ শরীকানা ব্যবসা। এতে যার যেমন অর্থ থাকবে, সে তেমন লভ্যাংশ পাবে (আবুদাঊদ হা/৪৮৩৬; সনদ ছহীহ, বুলূগুল মারাম হা/৮৭০; নায়ল হা/২৩৩৪-৩৫)। অপরটির নাম মুযারাবাহ (مضاربة) অর্থাৎ একজনের অর্থ নিয়ে অপর জন ব্যবসা করবে। এ পদ্ধতিতে লভ্যাংশ তাদের মাঝে চুক্তিহারে বন্টিত হবে (দারাকুৎনী হা/৩০৭৭; মুওয়াত্ত্বা হা/২৫৩৫; ইরওয়াউল গালীল হা/১৪৭২, ৫/২৯২ পৃঃ; বুলূগুল মারাম হা/৮৯৫, মওকূফ ছহীহ)। প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যবসা এ দুয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়।
 

সঊদী আরবের জাতীয় গবেষণা ও ফাতাওয়া বিভাগের স্থায়ী কমিটি (লাজনা দায়েমাহ) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে, পিরামিড স্কীম, নেটওয়ার্ক মার্কেটিং বা এমএলএম যে নামেই হোক না কেন এ ধরনের সকল প্রকার লেনদেন নিষিদ্ধ। কেননা এর উদ্দেশ্য হল, কোম্পানীর জন্য নতুন নতুন সদস্য সৃষ্টির মাধ্যমে কমিশন লাভ করা, পণ্যটি বিক্রি করে লভ্যাংশ গ্রহণ করা নয়। এ কারবার থেকে বহুগুণ কমিশন লাভের প্রলোভন দেখানো হয়। স্বল্পমূল্যের একটি পণ্যের বিনিময়ে এরূপ অস্বাভাবিক লাভ যে কোন মানুষকে প্ররোচিত করবে। আর এতে ক্রেতা-পরিবেশকদের মাধ্যমে কোম্পানী এক বিরাট লাভের দেখা পাবে। মূলতঃ পণ্যটি হল কোম্পানীর কমিশন ও লাভের হাতিয়ার মাত্র।
 

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের নেটওয়ার্ক ব্যবসা অসম মূল্য নির্ধারণ ও অতিরঞ্জিত আয়ের প্রলোভন দেখানোর কারণে অভিযুক্ত হয়েছে। আমেরিকার ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC) ২০০৮ সালের মার্চ মাসে তাদের প্রস্তাবিত ব্যবসায় সুযোগ সম্বন্ধীয় তালিকা থেকে এমএলএম কোম্পানীগুলোর নাম বাদ দিয়েছে। সংস্থাটি গ্রাহকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, নতুন সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে কমিশন গ্রহণ করার এই রীতি (এমএলএম) বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পিরামিড স্কীম পদ্ধতির ন্যায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে (দ্রঃ Multi-level marketing-উইকিপিডিয়া)। 


তত্ত্বগতভাবেও এ ধরনের মার্কেটিং বিষয়ে অনেক আপত্তি রয়েছে। কেননা এ মার্কেটিং-কে বলা হয়েছে, MLM is like a train with no brakes and no engineer headed full-throttle towards a terminal. অর্থাৎ সর্বোচ্চ গতিতে স্টেশনমুখী একটি ট্রেনের মত যার কোন ব্রেক নেই, নেই কোন চালক (দ্রঃ www.vandruff.com/mlm.html)।
 

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এ ব্যবসা সমর্থন করা যায় না। কেননা একজন গ্রাহককে তার আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের বশীভূত করে পণ্য বিক্রয় করতে বলা হয়। ফলে গ্রাহক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ককে সে ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থের কেন্দ্রে পরিণত করে। এ সম্পর্ক তখন হয়ে যায় যান্ত্রিক। নিষ্কলুষ বন্ধুত্বের স্থলে তখন সন্দেহ আর সংকীর্ণতাবোধ স্থান করে নেয়। নিজ গৃহ পরিণত হয় মার্কেট প্লেসে। যে কোন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন লোক এ কাজে ঘৃণাবোধ করবে।
 

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। এর মধ্যবর্তী বিষয়সমূহ অস্পষ্ট, যা অনেক মানুষ জানে না। অতএব যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ বস্তুসমূহ থেকে বেঁচে থাকবে, সে ব্যক্তি তার দ্বীন ও সম্মানকে পবিত্র রাখলো। আর যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ কাজে লিপ্ত হল, সে হারামে পতিত হ(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৬২)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সন্দিগ্ধ বিষয় পরিহার করে নিঃসন্দেহ বিষয়ের দিকে ধাবিত হও। কেননা সত্যে রয়েছে প্রশান্তি এবং মিথ্যায় রয়েছে সন্দেহ (তিরমিযী হা/২৫৮১; সনদ ছহীহ, মিশকাত হা/২৭৭৩)
 

অতএব আমাদের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এই যে, প্রশ্নে উল্লেখিত নামে বা অন্য নামে প্রচলিত এম.এল.এম ব্যবসা সমূহ শরীআত সম্মত হবে না। জান্নাত পিয়াসী মুমিনকে এসব থেকে বেঁচে থাকতে হবে (বিস্তারিত দেখুনঃ আত-তাহরীক, ডিসেম্বর ২০০৮ প্রশ্নোত্তর : ২/৮২ ডেসটিনি২০০০ ব্যবসা কি জায়েয?

শুক্রবার, ৩০ মার্চ, ২০১২

ওমর (রাঃ) মেয়েদের মোহরানা নির্ধারণ করে দিলে জনৈক মহিলা

প্রশ্ন  : ওমর (রাঃ) মেয়েদের মোহরানা নির্ধারণ করে দিলে জনৈক মহিলা তার বিরোধিতা করেছিলেন মর্মে যে ঘটনা প্রচলিত আছে তার প্রমাণ জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর : বায়হাক্বী (৭/২৩৩ পৃঃ) বর্ণিত উক্ত হাদীছটি মুনক্বাতি
অর্থাৎ যঈফ। তবে একই হাদীছ যা আবুদাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে, সেটি হাসান। তবে সেখানে মহিলার আপত্তির কথা বর্ণিত হয়নি। উল্লেখ্য যে, মোহরানা বেশী করায় কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং উক্ত আয়াত দ্বারা মুবাহ প্রমাণিত হয়। তবে সেটা হবে বরের আর্থিক অবস্থার বিবেচনায়। মোহরানায় কোন বাড়াবাড়ি করা যাবে না। বরং সর্বদা মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে (দ্রঃ তাফসীর কুরতুবী; নিসা ২০ ও ২১ আয়াত; বায়হাক্বী মোহরানা অধ্যায় ৭/২৩৩-৩৫)

শেয়ার ব্যবসা কি জায়েজ

প্রশ্ন  : বাজারে শেয়ার বেচাকেনা হয়। এর লাভ লটারীর মাধ্যমে শেয়ার হোল্ডারদের মাঝে বণ্টন করা হয় অথবা একাউন্টে জমা হয়। এভাবে লটারীর মাধ্যমে বেচাকেনা করা যাবে কি?
 
উত্তর : বিভিন্ন কারণে শেয়ার বেচাকেনা জায়েয নয়। যেমন- 


(১) ক্রেতার অনেক সময় সম্যক জ্ঞান থাকে না কী বস্তুর শেয়ার তিনি ক্রয় করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হারাম বস্তুর ক্রয়-বিক্রয় হারাম করেছেন (আবুদাঊদ হা/৩৪৮৮)। 

(২) যে বস্তুর শেয়ার কেনা-বেচা হয়, তা দেখা ও জানা-বুঝার সুযোগ থাকে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এমন ক্রয়-বিক্রয়কে ধোঁকা বলেছেন (মুসলিম হা/৩৮৮১; বুলূগুল মারাম হা/৭৮৪)। 

(৩) শেয়ার ব্যবসার পণ্য আয়ত্বে নিয়ে আসার সুযোগ থাকে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বস্তু ক্রয়ের পর তা নিজ মালিকানায় নিয়ে আসার পূর্বে বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন (মুসলিম হা/৩৯১৬ ও ৩৯২৫; বুলূগুল মারাম হা/৭৮৫)। 

(৪) শেয়ার ব্যবসা একটি জুয়া মাত্র। যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ মাল দেখে না। অথচ ঘণ্টায় ঘণ্টায় দর উঠা-নামা হয়। 

(৫) শেয়ার ব্যবসায় ফটকাবাজারীর প্রচুর সুযোগ রয়েছে। অনেক সময় কোম্পানী তার প্রকৃত তথ্য গোপন রাখে। কখনো লোকেরা কোম্পানীতে শেয়ার কিনে অধিক লাভ করে। কখনো কারখানা তৈরি না করেই তার শেয়ার বাজারে ছাড়া হয় এবং নতুন শেয়ারে অধিক লাভ মনে করে সেটিকে লোকেরা অধিক মূল্যে খরিদ করে। কোনরূপ ব্যবসা বা মালামাল ছাড়াই তারা এ লাভ করে থাকে। এছাড়াও নিত্যনতুন ছলচাতুরী শেয়ারবাজারে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে। 

(৬) এতে সূদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ শেয়ার ব্যবসা ব্যাংক থেকে সূদের ভিত্তিতে ঋণ নিয়ে করা হচ্ছে। অতএব শেয়ার ব্যবসা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক (দ্রঃ আত-তাহরীক ডিসেম্বর ২০১০, প্রশ্নোত্তর : ২৫/১০৫)