প্রবন্ধ--ইসলামের শিক্ষা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ--ইসলামের শিক্ষা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৬ এপ্রিল, ২০১২

আলেমগণের মধ্যে মতভেদের কারণ


আলেমগণের মধ্যে মতভেদের কারণ
 (২য় কিস্তি)
কারণ ৩ : ভিন্নমত পোষণকারীর নিকট হাদীছ পৌঁছেছে, কিন্তু সে ভুলে গেছে :
অনেক মানুষ আছে কখনও ভোলে না। কত মানুষ আছে  হাদীছ ভুলে যায়। এমনকি কখনও আয়াতও ভুলে যায়। রাসূল (ছাঃ) একদিন ছাহাবীগণকে নিয়ে ছালাত আদায় করছিলেন এবং তিনি ভুলক্রমে একটি আয়াত ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন উবাই ইবনু কাব (রাঃ)। ছালাত শেষে রাসূল (ছাঃ) বললেন,  তুমি কি আমাকে আয়াতটি স্মরণ করিয়ে দিতে পারনি!’(আবূদাঊদ হা/৯০৭, ছালাত অধ্যায়। )  অথচ তিনি সেই ব্যক্তি, যার উপর অহী নাযিল হয়েছে। রাসূল (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করেই আল্লাহ পাক বলেছেন,  অচিরেই আমি তোমাকে পাঠ করাবো, ফলে তুমি ভুলবে না। তবে আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তা ব্যতীত। নিশ্চয়ই তিনি প্রকাশ্য ও গুপ্ত বিষয় পরিজ্ঞাত আছেন (আলা ৬-৭)

এ ব্যাপারে আম্মার বিন ইয়াসির (রাঃ)-এর সাথে ওমর (রাঃ)-এর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। রাসূল (ছাঃ) তাঁদের দুজনকে কোন এক প্রয়োজনে পাঠালে তাঁরা উভয়েই নাপাক হয়ে যান। আম্মার (রাঃ) ইজতেহাদ করেন, মাটি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন বোধ হয় পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের ন্যায়। তাই তিনি মাটিতে গড়াগড়ি করতে লাগলেন, যেমনিভাবে পশু গড়াগড়ি দেয়। এরপর তিনি ছালাত আদায় করেন। অপরদিকে ওমর (রাঃ) ছালাতই আদায় করলেন না। অতঃপর তাঁরা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট আসলে তিনি তাঁদেরকে সঠিক নিয়ম বলে দেন। আম্মার (রাঃ)-কে তিনি বলেন, দুই হাত দিয়ে এরকম করলেই তোমার জন্য যথেষ্ট হত। (একথা বলে) তিনি তাঁর দুই হাত একবার মাটিতে মারলেন। অতঃপর বাম হাতকে ডান হাতের উপর বুলিয়ে উভয় হাতের তালু এবং মুখমন্ডল মাসাহ করলেন।

আম্মার (রাঃ) ওমর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে এ হাদীছটি বর্ণনা করেন। এমনকি তার আগেও এটি বর্ণনা করতেন। ইতিমধ্যে ওমর (রাঃ) তাঁকে একদিন ডেকে পাঠান এবং তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি এটি কি ধরনের হাদীছ বর্ণনা করছ? তখন আম্মার (রাঃ) বলেন, আপনার কি মনে পড়ে, রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে কোন এক প্রয়োজনে পাঠালে আমরা নাপাক হয়ে গিয়েছিলাম। ফলে আপনি ছালাত আদায় করলেন না। কিন্তু আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিয়েছিলাম। এরপর রাসূল (ছাঃ) বলেছিলেন, দুই হাত দিয়ে এরকম করলেই তোমার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ওমর (রাঃ) ঘটনাটি স্মরণ করতে পারলেন না। তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় কর হে আম্মার! অতঃপর আম্মার (রাঃ) তাঁকে বললেন, আল্লাহ কর্তৃক আমার উপর আপনার অনুসরণ যেহেতু আবশ্যক, সেহেতু আপনি নিষেধ করলে হাদীছটি আমি আর বর্ণনা করব না। তখন ওমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, আমাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করছ, তোমাকেও সে দায়িত্ব অর্পণ করলাম।( বুখারী হা/৩৩৮, ৩৪৫-৪৬, তায়াম্মুম অধ্যায়; মুসলিম হা/৩৬৮, হায়েয অধ্যায়। ) অর্থাৎ তুমি এই হাদীছ মানুষের কাছে বর্ণনা কর। দেখা গেল, সাধারণ অযূর ক্ষেত্রে যে তায়াম্মুম রাসূল (ছাঃ) নির্ধারণ করেছেন, ঠিক ঐ একই তায়াম্মুম বীর্যস্খলন জনিত কারণে অপবিত্র অবস্থায়ও নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু একথাটি ওমর (রাঃ) ভুলে গেছেন। তিনি এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ)-এর পক্ষেই ছিলেন। আর আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) ও আবু মূসা (রাঃ)-এর মাঝে এ বিষয়ে বিতর্কও হয়েছে। বিতর্কে আবু মূসা (রাঃ) ওমর (রাঃ)-এর উদ্দেশ্যে বলা আম্মার (রাঃ)-এর উক্তিটি পেশ করেন। তখন ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, তুমি কি দেখনি যে, ওমর (রাঃ) আম্মার (রাঃ)-এর কথায় পরিতুষ্ট হতে  পারেননি? অতঃপর আবু মূসা (রাঃ) বলেন, ঠিক আছে আম্মার (রাঃ)-এর কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু এই আয়াত সম্পর্কে তুমি কি বলবে? অর্থাৎ সূরা মায়েদার আয়াত। জবাবে ইবনু মাসঊদ (রাঃ) কিছুই বললেন না। অথচ নিঃসন্দেহে এখানে অধিকাংশ বিদ্বানের কথাই সঠিক, তারা বলছেন, বীর্যপাত জনিত কারণে অপবিত্র ব্যক্তি তায়াম্মুম করবে, যেমনিভাবে ছোট নাপাকীর কারণে অপবিত্র ব্যক্তি তায়াম্মুম করে থাকে।

এ ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ কখনও ভুলে যেতে পারে; এতে শারঈ কোন হুকুম তার কাছে অজানা থেকে যেতে পারে। ফলে সে যদি ভুলে কিছু বলে, তাহলে ওযরগ্রস্ত হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি দলীল জানবে, সে তো ওযরগ্রস্ত হিসাবে পরিগণিত হবে না।

কারণ ৪ : ভিন্নমত পোষণকারীর নিকট হাদীছ পৌঁছেছে, কিন্তু সে হাদীছের উদ্দেশ্যের বিপরীত অর্থ বুঝেছে :
এ ব্যাপারে আমরা দুটি উদাহরণ পেশ করব। একটি কুরআন থেকে এবং অপরটি হাদীছ থেকে।
১. কুরআন থেকে : মহান আল্লাহর বাণী, তোমরা যদি রোগগ্রস্ত হও কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও (মায়েদা ৬)
বিদ্বানগণ أَوْ لاَمَسْتُمُ النِّسَاءَ কিংবা তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ কর আয়াতাংশের অর্থ বুঝতে গিয়ে মতভেদ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ বুঝেছেন, স্বাভাবিক স্পর্শ। অন্যরা বুঝেছেন, যৌন উত্তেজনার সাথে স্পর্শ। আবার কেউ কেউ বুঝেছেন, সহবাস। শেষোক্তটি ইবনু আববাস (রাঃ)-এর অভিমত।

এখন আপনি যদি আয়াতটি নিয়ে ভালভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন যে, যাঁরা আয়াতাংশের অর্থ করেছেন সহবাস তাঁদের কথাই ঠিক। কেননা মহান আল্লাহ পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে দুই প্রকার পবিত্রতার কথা উল্লেখ করেছেন। একটি ছোট অপবিত্রতা (الحدث الأصغر) তে পবিত্রতা অর্জন এবং অপরটি (الحدث الأكبر)  বড় অপবিত্রতা হতে পবিত্রতা অর্জন। ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর বলেন,  তোমাদের মুখমন্ডল ধৌত কর এবং হাতগুলিকে কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও। আর মাথা মাসাহ কর এবং পাগুলিকে গোড়ালি পর্যন্ত ধুয়ে ফেল (মায়েদা ৬)

আর বড় অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি বলেন,  আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে পবিত্র হবে(মায়েদা ৬)

এক্ষণে বালাগাত ও ফাছাহাতের দাবী হচ্ছে, তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রেও দুই প্রকার পবিত্রতার কথা উল্লেখ করা। অতএব মহান আল্লাহর বাণী, অথবা তোমাদের কেউ যদি পায়খানা থেকে আসে দ্বারা ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর أَوْ لاَمَسْتُمُ النِّسَاءَ  ‘কিংবা তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ কর দ্বারা বড় অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানে আমরা যদি স্পর্শ (الملامسة) -কে [সহবাস অর্থে না নিয়ে] স্বাভাবিক স্পর্শ অর্থে নেই, তাহলে দেখা যায়, উক্ত আয়াতে ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের কারণ সমূহের দুটি কারণ উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বড় অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে কোন কিছুরই উল্লেখ নেই। আর এটি পবিত্র কুরআনের বালাগাতের পরিপন্থী। সুতরাং যারা আয়াতাংশের অর্থ সাধারণ স্পর্শ বুঝেছেন, তারা বলেছেন, কোন পুরুষ যদি স্ত্রীর শরীর স্পর্শ করে, তাহলে তার অযূ ভেঙ্গে যাবে। অথবা যদি সে যৌন কামনা নিয়ে স্ত্রীর শরীর স্পর্শ করে, তাহলে অযূ ভাঙবে। আর যৌন কামনা ছাড়া স্পর্শ করলে অযূ ভাঙবে না। অথচ সঠিক কথা হল, উভয় অবস্থাতেই অযু ভাঙবে না। কেননা হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুম্বন করলেন, অতঃপর ছালাত পড়তে গেলেন, অথচ অযূ করলেন না। (আবূদাঊদ হা/১৭৮-৭৯, পবিত্রতা অধ্যায়; তিরমিযী হা/৮৬; ইবনু মাজাহ হা/৫০২-৫০৩।) আর এই বর্ণনাটি কয়েকটি সূত্রে এসেছে, যার একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে।

২. হাদীছ থেকে : রাসূল (ছাঃ) যখন আহ্‌যাবের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে যুদ্ধাস্ত্র খুলে রাখলেন, তখন জিবরীল (আঃ) এসে তাঁকে বললেন, আমরা অস্ত্র ছাড়িনি। সুতরাং আপনি বনী ক্বোরায়যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ুন। ফলে রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীগণকে বেরিয়ে পড়ার আদেশ দিলেন এবং বললেন, তোমাদের কেউ যেন বনী ক্বোরায়যার নিকট পৌঁছা ছাড়া আছরের ছালাত না পড়ে। দেখা গেল, ছাহাবীগণ এই হাদীছটি বুঝার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করলেন। তাঁদের কেউ কেউ বুঝলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর উদ্দেশ্য হল, বনী ক্বোরায়যার উদ্দেশ্যে দ্রুত রওয়ানা করা, যাতে আছরের সময় হওয়ার আগেই তাঁরা বনী ক্বোরায়যাতে পৌঁছে যান। সেজন্য তাঁরা রাস্তায় থাকা অবস্থায় যখন আছরের ছালাতের সময় হল, তখন ছালাত আদায় করে নিলেন এবং ছালাতের শেষ ওয়াক্ত পর্যন্ত ছালাতকে বিলম্বিত করলেন না। আবার তাঁদের অনেকেই বুঝলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর উদ্দেশ্য হল, তাঁরা যেন বনী ক্বোরায়যায় পৌঁছার পূর্বে ছালাত আদায় না করে। সেজন্য তাঁরা ছালাতকে বনী ক্বোরায়যাতে পৌঁছার সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করলেন; এমনকি ছালাতের ওয়াক্তও শেষ হয়ে গেল। (বুখারী হা/৯৪৬ ভয়-ভীতি অধ্যায়; মুসলিম হা/১৭৭০।)

নিঃসন্দেহে যাঁরা সঠিক সময়ে ছালাত আদায় করেছেন, তাঁদের বুঝই ছিল সঠিক। কেননা সময়মত ছালাত ওয়াজিব হওয়ার উদ্ধৃতিগুলি মুহকাম (محكمة) বা সুস্পষ্ট পক্ষান্তরে এই উদ্ধৃতিটি হচ্ছে মুতাশাবিহ (مةشابهة) বা অস্পষ্ট আর নিয়ম হচ্ছে, মুহকাম মুতাশাবিহ-এর উপর প্রাধান্য পাবে। অতএব বুঝা গেল, কোন দলীলকে আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (ছাঃ)-এর উদ্দেশ্যের উল্টা বুঝা মতানৈক্যের অন্যতম একটি কারণ।

কারণ ৫ : ভিন্নমত পোষণকারীর নিকটে হাদীছ পৌঁছেছে। কিন্তু হাদীছটি রহিত এবং সে রহিতকরণ সম্পর্কে জানে না :
হাদীছটি ছহীহ এবং তার অর্থ ও তাৎপর্যও বোধগম্য। কিন্তু তা রহিত। আর উক্ত আলেম যেহেতু হাদীছটি রহিত হওয়ার বিষয়ে জানেন না, সেহেতু সেটি তার জন্য ওযর হিসাবে গণ্য হবে। কেননা [শারঈ বিধানের ক্ষেত্রে] আসল ল, রহিত হওয়ার ইলম না থাকলে, রহিত না হওয়া।

এ কারণে মুছল্লী রুকূতে গিয়ে কিভাবে তার হস্তদ্বয় রাখবে, সে বিষয়ে ইবনু মাসঊদ (রাঃ) ভিন্নমত পোষণ করেছেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুছল্লীর জন্য বৈধ ছিল (রুকূতে) দুই হাত একত্রে করে দুই হাঁটুর মাঝখানে রাখা। কিন্তু পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে যায় এবং দুই হাত দুই হাঁটুর উপরে রাখার বিধান চালু হয়। ছহীহ বুখারীসহ অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে রহিত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। (বুখারী হা/৭৯০, আযান অধ্যায়। ) কিন্তু ইবনু মাসঊদ (রাঃ) রহিত হওয়ার বিষয়টি জানতেন না। ফলে তিনি দুই হাত একত্র করে দুই হাঁটুর মাঝখানেই রাখতেন। [একদিন] তাঁর পাশে আলক্বামা ও আল-আসওয়াদ (রাঃ) ছালাত পড়লে এবং তাঁরা তাঁদের দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখলেন। কিন্তু ইবনু মাসঊদ (রাঃ) তাঁদেরকে অনুরূপ করতে নিষেধ করলেন এবং দুই হাতকে একত্রিত করে দুই হাঁটুর মাঝখানে রাখার আদেশ করলেন।( মুসলিম হা/৫৩৪ মসজিদ সমূহ অধ্যায়।) কারণ তিনি রহিত হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেননি। আর মানুষের উপর তার সাধ্যের বাইরে কোন কিছু চাপানো হয়নি। মহান আল্লাহ বলেন, لاَ يُكَلِّفُ اللهُ نَفْساً إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ- আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। সে তাই পায়, যা সে উপার্জন করে। আর তাই তার উপর বর্তায়, যা সে করে (বাক্বারাহ ২৮৬)

কারণ ৬ : ভিন্নমত পোষণকারীর নিকট দলীল পৌঁছলেও তাকে তার চেয়ে শক্তিশালী দলীল বা ইজমা-এর বিরোধী মনে করা :
দলীল পেশকারীর কাছে দলীল পৌঁছেছে; কিন্তু তাঁর মতে, উক্ত দলীল তার চেয়ে শক্তিশালী দলীল বা ইজমা-এর বিরোধী। আর আলেমগণের মতানৈক্যের ক্ষেত্রে এই কারণটিই অনেক বেশী। সেজন্য আমরা কোন কোন আলেমকে ইজমার উদ্ধৃতি অধিক দিতে শুনি। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তা ইজমা নয়।
ইজমার উদ্ধৃতি পেশের ক্ষেত্রে একটি অদ্ভূত উদাহরণ হচ্ছে- কেউ কেউ বলেন, দাসের সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, দাসের সাক্ষ্য গ্রহণীয় নয় মর্মে তারা একমত হয়েছেন। এটি অদ্ভূত একটি বর্ণনা! কেননা কেউ কেউ যখন তাঁর আশেপাশের সবাইকে কোন বিষয়ে একমত হতে দেখেন, তখন সেই বিষয়টি উদ্ধৃতি সমূহের [কুরআন-হাদীছের উদ্ধৃতি] অনুকূলে ভাবেন এবং মনে করেন, তাঁদের বিরোধী কোন দলীল নেই। সেজন্য তাঁর ব্রেইনে দুই ধরনের দলীলের সমাবেশ ঘটে-  উদ্ধৃতি ও ইজমা। কখনও তিনি মনে করেন, ঐ বিষয়টি সঠিক কিয়াস এবং দৃষ্টিভঙ্গিরও অনুকূলে। ফলে তিনি ঐ বিষয়ে মতানৈক্য না থাকার পক্ষে মত প্রকাশ করেন এবং সঠিক ক্বিয়াসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উদ্ধৃতির বিরোধী কোন দলীল আছে বলে তিনি মনে করেন না। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি ছিল উল্টা।

আমরা রিবাল ফায্ল (رِبَا الْفَضْلِ) -এর ক্ষেত্রে ইবনু আববাস (রাঃ)-এর অভিমতটিকে উদাহরণ হিসাবে পেশ করতে পারি -
রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّمَا الرِّبَا فِيْ النَّسِيَّةِ সূদ শুধুমাত্র রিবান-নাসিইয়াহ-এর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ।(বুখারী হা/২১৭৮-৭৯,ব্যবসা-বাণিজ্য অধ্যায়; মুসলিম হা/১৫৯৬; ইবনু মাজাহ হা/১৫৮৭ ব্যবসা-বাণিজ্য অধ্যায়।) উবাদাহ ইবনু ছামেত (রাঃ) সহ অন্যান্য ছাহাবী থেকে বর্ণিত হাদীছে প্রমাণিত হয়েছে, রিবান-নাসিইয়াহ এবং রিবাল ফায্ল উভয় ক্ষেত্রেই সূদ হবে।(মুসলিম হা/১৫৮৭।)

ইবনু আববাস (রাঃ)-এর পরে সকল আলেম একমত হয়েছেন যে, সূদ দুই প্রকার- (১) রিবাল ফায্ল (ربا الفضل)  ও (২) রিবান নাসিইয়াহ (ربا النسيئة) । কিন্তু ইবনু আববাস (রাঃ) নাসিইয়াহ ব্যতীত অন্য কিছুতে সূদ হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। যেমন যদি আপনি হাতে হাতে এক ছা গম দুই ছা গমের বিনিময়ে বিক্রয় করেন, তাহলে ইবনু আববাস (রাঃ)-এর নিকটে কোন সমস্যাই নেই। কেননা তাঁর মতে, সূদ কেবলমাত্র নাসিইয়াহ-এর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ।

অনুরূপভাবে যদি তুমি দুই মিছক্বাল [সোনার ওযন বিশেষ] সোনার বিনিময়ে এক মিছক্বাল সোনা হাতে হাতে বিক্রয় কর, তাহলে তাঁর নিকটে সূদ হবে না। তবে যদি গ্রহণ করতে দেরী কর অর্থাৎ তুমি আমাকে যদি এক মিছক্বাল সোনা দাও কিন্তু আমি তার মূল্য যদি তোমাকে এখন না দিয়ে উভয়ে বেচাকেনার বৈঠক থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরে দেই, তাহলে সেটি সূদ হবে। কেননা ইবনু আববাস (রাঃ)-এর মতে, হাদীছে উল্লেখিত এই সীমাবদ্ধতা নাসীয়াহ ছাড়া অন্য কিছুতে সূদ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। আর আসলেই (إنما) শব্দটি সীমাবদ্ধতা অর্থে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং তা [নাসিইয়াহ] ছাড়া অন্য কিছুতে সূদ হবে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উবাদাহ (রাঃ)-এর হাদীছ প্রমাণ করে যে, রিবাল ফাযলও সূদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ زَادَ أَوْ اسْتَزَادَ فَقَدْ أَرْبَى، যে ব্যক্তি বেশী দিল বা নিল, সে সূদী কারবার করল।(মুসলিম হা/১৫৮৮।)

এক্ষণে ইবনু আববাস (রাঃ) কর্তৃক দলীল হিসাবে পেশকৃত হাদীছের ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা কি হবে?
আমাদের ভূমিকা হবে, হাদীছটিকে আমরা এমন অর্থে গ্রহণ করব, যাতে রিবাল ফায্ল-কে সূদ গণ্যকারী হাদীছের সাথে এই হাদীছও মিলে যায়। সেজন্য আমরা বলব, মারাত্মক সূদ হচ্ছে, রিবান নাসিইয়াহ, যার কারবার জাহেলী যুগের লোকেরা করত এবং যে সম্পর্কে কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لاَ تَأْكُلُوْا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সূদ খেও না (আলে ইমরান ১৩০)। এটা হল রিবান-নাসিইয়াহ। তবে রিবাল ফাযল তদ্রূপ মারাত্মক নয়। সেকারণে ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) তাঁর জগদ্বিখ্যাত লামুল মুওয়াক্কেঈন গ্রন্থে বলেন, মূল সূদের অন্যতম মাধ্যম হওয়ার কারণে রিবাল ফায্ল-কে হারাম করা হয়েছে। সেটিই যে মূল সূদ, সে হিসাবে নয়।
[চলবে]

বৃহস্পতিবার, ২৯ মার্চ, ২০১২

আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে কতিপয় ভ্রান্ত আক্বীদা


আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে কতিপয় ভ্রান্ত আক্বীদা
 (শেষ কিস্তি)
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাটির তৈরী না নূরের?
আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে মাটি থেকে, জিন জাতিকে আগুন থেকে এবং ফেরেশতাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ মাটির তৈরী একথা পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)ও মানুষ ছিলেন এবং তিনিও মাটির তৈরী ছিলেন। এক্ষেত্রে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তবে অনেকে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) নূরের সৃষ্টি, অথচ কুরআন-সুন্নাহ বলছে তিনি মাটি থেকে সৃষ্টি। সাধারণভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর পিতা-মাতা মাটির তৈরী সাধারণ মানুষ ছিলেন। তাদের উভয়ের মিলনের ফলে তিনি জন্ম লাভ করেছেন। মাটির মানুষ থেকে মাটির মানুষই সৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাটির মানুষ থেকে কি করে নূরের তৈরী মানুষের জন্ম হতে পারে?

রাসূল (ছাঃ) বিবাহ করেছিলেন, তাঁর সন্তান-সন্ততিও ছিল। তাঁরা সবাই মাটির মানুষ ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) খাবার খেতেন, সাধারণ মানুষের মতই জীবন-যাপন করতেন এবং তাঁর প্রয়োজন ছিল পেশাব-পায়খানার। অন্য সব মানুষের মত নবী করীম (ছাঃ) মৃত্যু বরণও করেছেন। সুতরাং কোন জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ রাসূল (ছাঃ)-কে নূরের সৃষ্টি বলতে পারে না। পূর্বযুগের কাফেররা নবী-রাসূলদেরকে মেনে নিতে চাইতো না; কারণ তাঁরা সবাই মাটির মানুষ ছিলেন। সকল নবী-রাসূলগণ যেমন মাটির মানুষ ছিলেন তেমনি নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)ও মাটির মানুষ ছিলেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বিশদ বিবরণ উপস্থাপিত হয়েছে।
কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার মূল উপাদান হতে (মুমিনূন ১২)

পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ যে মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন, এ মর্মে কুরআন থেকে দলীল :
(১) নূহ (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,  আর তার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা যারা কাফের ছিল, তারা বলল, আমরা তো তোমাকে আমাদের মতই মানুষ ব্যতীত কিছু দেখছি না (হূদ ২৭)

(২) আল্লাহ বলেন,  তাদের রাসূলগণ বলেছিলেন, আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোন সন্দেহ আছে, যিনি আকাশ সমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা? তিনি তোমাদেরকে আহবান করেন তোমাদের পাপ মার্জনা করার জন্য এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দিবার জন্য? তারা বলত, তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ (ইবরাহীম ১০)

(৩) আল্লাহ বলেন, তাদের রাসূলগণ তাদেরকে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের মত মানুষ (ইবরাহীম ১১)

(৪) আল্লাহ বলেন,  যখন তাদের নিকট আসে পথ-নির্দেশ, তখন লোকদেরকে এই উক্তিই বিশ্বাস স্থাপন হতে বিরত রাখে, আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন? (বানী ইসরাঈল ৯৪)

(৫) আল্লাহ বলেন,   ‘যারা যালিম তারা গোপনে পরামর্শ করে, এতো তোমাদের মত একজন মানুষই (আম্বিয়া ৩)

(৬) নূহ (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,  ‘তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ যারা কুফরী করেছিল, তারা বলল, এতো তোমাদের মত একজন মানুষ (মুমিনুন ২৪)

(৭) আল্লাহ বলেন, তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যারা কুফরী করেছিল ও আখিরাতের সাক্ষাৎকারকে অস্বীকার করেছিল এবং যাদেরকে আমি দিয়েছিলাম পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগ-সম্ভার, তারা বলেছিল, এতো তোমাদের মত একজন মানুষ, তোমরা যা আহার কর সেও তাই আহার করে এবং তোমরা যা পান কর সেও তাই পান করে। যদি তোমরা তোমাদেরই মত একজন মানুষের আনুগত্য কর, তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে (মুমিনূন ৩৩-৩৪)

(৮) মূসা এবং হারূণ (আঃ) সম্পর্কে ফেরাঊন ও তার কওম বলল,- তারা বলল, আমরা কি এমন দুব্যক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করব, যারা আমাদেরই মত এবং তাদের সম্প্রদায় আমাদের দাসত্ব করে (মুমিনূন ৪৭)

(৯) ঈসা (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের অনুরূপ; তিনি তাঁকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করলেন (আলে ইমরান ৫৯)

মুহাম্মাদ (ছাঃ) মাটির তৈরী এ সম্পর্কে কুরআনের দলীল :
(১) আল্লাহ তাআলা বলেন,  বলুন, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক! আমি তো শুধু একজন মানুষ, একজন রাসূল (বানী ইসরাঈল ৯৩)

(২) আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,  বলুন, আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের মাবূদ একজন। সুতরাং যে তাঁর প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তাঁর প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে (কাহফ ১১০)

(৩) আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,  ‘বলুন, আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি অহী হয় যে, তোমাদের মাবূদ একমাত্র (সত্য) মাবূদ (হা-মীম সিজদা ৬)

উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, সমস্ত নবী রাসূলগণ মাটির মানুষ ছিলেন। অনুরূপভাবে আমাদের নবীও মাটির মানুষ ছিলেন। মানুষের অভ্যাস ভুলে যাওয়া, অপারগ ও অসুস্থ হওয়া, ক্ষুধা-তৃষ্ণা লাগা, বিবাহ করা, সন্তান-সন্ততি হওয়া ইত্যাদি। এ সকল গুণ নবী-রাসূল সবার মাঝেই ছিল। তাঁদের সবার পিতা-মাতা ছিল, তাঁদের সবার স্ত্রী-পরিবার ছিল। তাঁরা খেতেন, পান করতেন, রোগ ও বালা-মুছীবতে পতিত হতেন। তাঁরা অনেক সময় ভুলেও যেতেন। এ সকল গুণ দ্বারা সহজেই বুঝা যায় যে, তাঁরা সবাই মাটির সৃষ্টি মানুষ ছিলেন, নূরের তৈরী ছিলেন না।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাটির মানুষ ছিলেন, এ সম্পর্কে হাদীছের দলীল :
রাসূল (ছাঃ)-এর অনেক সময় ভুল-ত্রুটি হত। ছালাত আদায়ের সময় যখন তিনি ভুলে যেতেন, তখন বলতেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমি ভুলে যাই, যেমনভাবে তোমরা ভুলে যাও। সুতরাং আমি ভুলে গেলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে।(বুখারী, হা/৪০১; মুসলিম, হা/১২৭৪।)

সকল ফেরেশতা নূর থেকে সৃষ্টি এবং আদম সন্তান সবাই পানি ও মাটি থেকে সৃষ্টি। আর জিন জাতি আগুন থেকে সৃষ্টি। যেমন হাদীছে এসেছে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন,  সকল ফেরেশতাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং জিন জাতিকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আদম জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই সমস্ত ছিফাত দ্বারা, যে ছিফাতে তোমাদের ভূষিত করা হয়েছে। অর্থাৎ মানব জাতিকে মাটি ও পানি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৭০১। )

এই হাদীছটি সমাজে বহুল প্রচলিত হাদীছকে বাতিল করে। তা হচ্ছে হে জাবের আল্লাহ সর্বপ্রথম তোমার নবীর নূরকে সৃষ্টি করেছেন। অনুরূপ অন্য যে হাদীছগুলোতে বলা হয়েছে, রাসূল (ছাঃ) নূরের তৈরী, সেগুলোও বাতিল। কারণ উপরোক্ত হাদীছটি প্রমাণ করে যে, সকল ফেরেশতা নূর থেকে সৃষ্ট; আদম সন্তান নয়।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাটির মানুষ ছিলেন, এ সম্পর্কে মনীষীগণের অভিমত :
ইমাম ইবনে হাযম (রহঃ) বলেন, সমস্ত নবী এবং ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর বান্দা, তাঁরা সমস্ত মানুষের মতই সৃষ্ট মানব। সবার জন্ম হয়েছে নারী-পুরুষের সংমিশ্রণে। শুধুমাত্র আদম এবং ঈসা (আঃ) ব্যতীত। অবশ্য আদমকে আল্লাহ তাআলা মাটি থেকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, কোন নারী পুরুষের সংমিশ্রণ ছাড়া। আর ঈসা (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন তাঁর মায়ের পেট থেকে কোন পুরুষের স্পর্শ ছাড়া। ( ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা, ১/২৯। )

শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে বায (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি এ বিশ্বাসের উপর মৃত্যুবরণ করবে যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মাটির মানুষ নয় বা আদম সন্তান নয় অথবা বিশ্বাস করে যে, তিনি অদৃশ্যের খবর জানেন, এটা কুফরী এবং একে বড় কুফরী গণ্য করা হবে অর্থাৎ ইসলাম থেকে বহিষ্কারকারী কুফরী। (মাজমূ ফাতাওয়া ৫/৩১৯। )

কুরআন বলছে, সকল নবী-রাসূল মাটির তৈরী। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজেও বলেছেন, আমি তোমাদের মতই মানুষ। বিদ্বানগণ বলছেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মাটির মানুষ, সকল নবী-রাসূল এবং সকল সাধারণ মানুষের মত। এর পরেও যদি কেউ মিথ্যা বানোয়াট হাদীছ উল্লেখ করে বলে, তিনি নূরের তৈরী, তাহলে সে হবে আক্বীদাভ্রষ্ট।

রাসূল সম্পর্কে জাল বা বানাওয়াট হাদীছ সমূহ
(১) জাবের (রাঃ) একদা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হউক। আপনি বলুন, আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কোন বস্তু সৃষ্টি করেছেন? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উত্তরে বললেন, হে জাবের! আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম তাঁর নূর দ্বারা তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা সে নূরকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগ দ্বারা কলম, এক ভাগ দ্বারা লাওহে মাহফূয ও একভাগ দ্বারা আরশে আযীম সৃষ্টি করেছেন। এভাবে ক্রমান্বয়ে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, আসমান-যমীন ফেরেশতা, জিন প্রভৃতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। (মৌলভী মুহাম্মদ যাকির হুসাইন, মুকাম্মাল মীলাদে মুস্তফা (সঃ), পৃঃ ৪১। )  এই হাদীছটি বাতিল, কোন হাদীছ গ্রন্থে হাদীছটি পাওয়া যায় না।

(২) লাওহে মাহফূয সৃষ্টির পর তাতে আল্লাহর নামের পার্শ্বে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নাম অর্থাৎ কালেমায় তাইয়িবাহ লিখে রাখা হয়। ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, জান্নাতে আদম (আঃ) যখন আল্লাহর একটি আদেশ লংঘন করে পরে নিজ ভুল বুঝতে পারলেন, তখন তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট এভাবে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ রাববুল আলামীন! আপনি আমাকে মুহাম্মাদের অসীলায় ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ পাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আদম! তুমি মুহাম্মাদকে চিনলে কিভাবে, তাঁকে তো আমি এখন পর্যন্ত সৃষ্টি করিনি? তখন আদম (আঃ) বললেন, হে দয়াময় প্রভু! আমাকে সৃষ্টি করে যখন আপনি আমার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন, তখন আমি চক্ষু মেলে তাকিয়ে দেখলাম, আরশের গায়ে লেখা রয়েছে লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা-হ। তখন আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই আপনি ঐ ব্যক্তির নাম আপনার নিজের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন, যিনি আপনার নিকট সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। আল্লাহ তাআলা বললেন, হে আদম! তুমি ঠিকই বলেছ। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ সৃষ্টি জগতের মধ্যে আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। এমনকি তাঁকে সৃষ্টি না করলে আমি তোমাকেও সৃষ্টি করতাম না। (মুকাম্মাল মীলাদে মুস্তফা (সঃ), পৃঃ ৪১। )

ইমাম ত্বহাবী বলেন, হাদীছটি আহলুল ইলমের নিকট নিতান্ত দুর্বল। ( তাহযীবুত তাহযীব ২/৫০৮ পৃঃ। ) আবূদাঊদ, আবূ যুরআ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম দারা-কুত্বনী এবং ইবনে হাজার আস-ক্বালানী সবাই বলেন, হাদীছটি দুর্বল।(ইমাম নাসাঈ, কিতাবুয যুআফা ওয়াল মাতরূকীন, পৃঃ ১৫৮, হা/৩৭৭। )

ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, হাদীছটি যে দুর্বল এ ব্যাপারে সবাই একমত। নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, হাদীছটি বানাওয়াট।(সিলসিলা যঈফা হা/২৫। ) ইমাম আলুসী হানাফী বলেন, হাদীছটির কোন ভিত্তিই নেই।(গায়াতুল আমানী ১/৩৭৩)

(৩) হাদীছে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় প্রিয়তম নবী (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, যদি আপনাকে সৃষ্টি না করতাম, তবে নিশ্চয়ই এ কুল-মাখলূক সৃষ্টি করতাম না।(মুকামমাল মীলাদে মুস্তফা (সঃ), পৃঃ ৪০। ) হাদীছটি বানাওয়াট, বাতিল।

(৪) হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)! আপনি না হলে আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতাম না। ( আবুল হাসান আল-কাত্তানী, তানযীহুশ শরীআত আন আহাদীছিশ শীআ, ১/৩২৫। ) ইবনু জাওযী বলেন, হাদীছটি যে বানাওয়াট এতে কোন সন্দেহ নেই। ইমাম দারা-কুত্বনী বলেন, হাদীছটি দুর্বল। ফালাস বলেন, হাদীছটি বানাওয়াট।(ইবনুল জাওযী, কিতাবুল মাওযূআত, ২/১৯। )

(৫) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন,  অর্থাৎ আল্লাহ রাববুল আলামীন সর্বপ্রথম আমার নূরকে সৃষ্টি করেছেন। (মুকাম্মাল মীলাদে মুস্তফা (সঃ), পৃঃ ৭৭। ) এটা হাদীছ নয়; বরং ছূফীদের বানাওয়াট কথা।

(৬) হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)। আপনি না হলে আসমান-যমীন, আরশ-কুরশী, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদি কিছুই সৃষ্টি করা হত না। ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, এটি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ নয়। এটি কোন বিদ্বান তাঁদের হাদীছ গ্রন্থে হাদীছে রাসূল বলে উল্লেখ করেননি এবং ছাহাবায়ে কেরাম থেকেও বর্ণিত হয়নি। বরং এটি এমন একটি কথা, যার বক্তা জানা যায় না। (মাজমূ ফাতাওয়া ১১/৯৬। )

(৭) আদম (আঃ) সৃষ্টি হয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে জ্যোতির্ময় নক্ষত্র রূপে মুহাম্মাদের নূর অবলোকন করে মুগ্ধ হন।

(৮) মিরাজের সময় আল্লাহ পাক তাঁর নবীকে জুতা সহ আরশে আরোহন করতে বলেন, যাতে আরশের গৌরব বৃদ্ধি পায় (নাঊযুবিল্লাহ)

(৯) রাসূলের জন্মের খবরে খুশি হয়ে আঙ্গুল উঁচু করার কারণে ও সংবাদ দানকারিণী দাসী ছুওয়াবাকে মুক্তি দেয়ার কারণে জাহান্নামে আবু লাহাবের হাতের দুটি আঙ্গুল পুড়বে না। এছাড়াও প্রতি সোমবার রাসূল (ছাঃ)-এর জন্ম দিবসে জাহান্নামে আবু লাহাবের শাস্তি মওকূফ করা হবে বলে আববাস (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে দেখা একটি স্বপ্নের বর্ণনা তাঁর নামে সমাজে প্রচলিত আছে, যা ভিত্তিহীন।

(১০) মা আমেনার প্রসবকালে জান্নাত হতে বিবি মরিয়াম, বিবি আসিয়া ও মা হাজেরা দুনিয়ায় নেমে এসে সবার অলক্ষ্যে ধাত্রীর কাজ করেন।

(১১) নবীর জন্ম মুহূর্তে কাবার প্রতিমাগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে, রোমের অগ্নি উপাসকদের শিখা অনির্বাণগুলো দপ করে নিভে যায়। বাতাসের গতি, নদীর প্রবাহ, সুর্যের আলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ইত্যাদি...। ( মৌলুদে দিল পছন্দ, মৌলুদে ছাদী, আল-ইনছাফ, মিলাদ মাহফিল প্রভৃতি দ্রষ্টব্য। ) উপরের বিষয়গুলো সবই বানাওয়াট ও ভিত্তিহীন।( বিস্তারিদ দ্রঃ মাওযুআতে কবীর প্রভৃতি; ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, মীলাদ প্রসঙ্গ, পৃঃ ১২।)

পরিশেষে বলব, আল্লাহ ও রাসূল সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বর্ণনা মোতাবেক সঠিক আক্বীদা পোষণ করতে হবে। তাঁদের প্রতি যথাযথ ঈমান আনতে হবে। তাহলেই প্রকৃত মুমিন হওয়া যাবে। ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণ করে যেমন মুমিন হওয়া যাবে না, তেমনি পরকালে নাজাতও মিলবে না। আল্লাহ আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন-আমীন!